লটারি বাতিল হওয়ায় শুরু হাজার কোটি টাকার কোচিং বাণিজ্য
স্কুলে ছাত্রছাত্রী ভর্তিতে লটারি প্রথা বাতিল করে ভর্তি পরীক্ষায় ফেরার সিদ্ধান্তে শুরু হয়ে গেছে হাজার কোটি টাকার কোচিং বাণিজ্য। মোহাম্মদপুরে একটি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ইসাক একাডেমিক পড়ালেখা কমিয়ে দিয়ে ভালো স্কুলে পড়ার আশায় তৃতীয় শ্রেণির ভর্তি কোচিংয়ের ক্লাস শুরু করে দিয়েছেন। সেন্ট যোসেফ এবং রেসিডেনসিয়াল স্কুলে ভর্তি হওয়াই তার টার্গেট।
তার মা আয়শা বেগম বলেন, ‘এখন থেকে ইসাকের স্কুলে কম পাঠাবেন। কোচিংয়ে পড়া বেশি করে পড়াবেন, যাতে ভর্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে সেন্ট যোসেফ কিংবা রেসিডেনসিয়াল স্কুলে ভর্তি হতে পারেন।’ শুধু ইসাক নয়, তার মতো অসংখ্যা শিক্ষার্থী একাডেমিক পড়া কমিয়ে দিয়ে ভর্তি কোচিংয়ে বেশি সময় অতিবাহিত করছে। জানা গেছে, রাজধানীর ভালো স্কুলে ভর্তির গ্যারান্টিসহ নানা চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে অলিগলিতে খোলা হয়েছে ভর্তি কোচিং সেন্টার। পত্রিকার ভেতরে করে ঘরে ঘরে পাঠানো হচ্ছে লিফলেট; এসব লিফলেটে থাকছে কোচিং সেন্টারের স্কুলের শিক্ষক পরিচিতি, বিগত দিনে কোচিং করে কতজন নাম করা স্কুলে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন সেসব শিক্ষার্থীদের ছবিসহ চটকদার বিজ্ঞাপন।
রাজধানীর ‘নামিদামি’ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিবাণিজ্য এবং কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করতে ২০১৯ সাল থেকে শিক্ষার্থী ভর্তিতে পরীক্ষার পরিবর্তে লটারি সিস্টেম চালু করেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরপর থেকে শিক্ষার্থী ভর্তিতে বাণিজ্য বন্ধের পাশাপাশি কোচিং ব্যবসায় ধস নামে। গত ১৬ মার্চ রাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা বিভাগের এক আদেশে দেশের সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তির প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়েছে। শিক্ষাবিদরা বলেন, উন্নত দেশগুলোতে প্রাথমিক স্তরে কোনো ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হয় না, সেখানে মেধাতালিকা বা পরীক্ষার বদলে এলাকাভিত্তিক বা ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়া’ পদ্ধতি অনুসরণ করে ভর্তির ব্যবস্থা করা হয়; অবশ্য এসব দেশের সব স্কুলের মান একই রকম হওয়ায় ‘এলিট স্কুল’ কালচার নেই। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সরকারের এ সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থী ভর্তিকে পুঁজি করে ভর্তি বাণিজ্য আর কোচিং বাণিজ্য শুরু হবে সারা দেশে। শিক্ষাব্যবস্থায় তৈরি হবে পাহাড়সম বৈষম্য। তথাকথিত ভালোমানের স্কুলগুলোতেও নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের সন্তানরা ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবে না।
শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘আসল সমাধান হলো সারা দেশের সব এলাকায় মানসম্মত প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি স্কুল নিশ্চিত করা। কিন্তু যেহেতু তা নেই, তাই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভর্তিতে লটারিই ছিল অধিকতর ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থা। লটারি বাদ দেওয়ায় সেই পুরোনো বৈষম্যই ফিরে আসবে—যেখানে শিক্ষিত ও সচ্ছল মা-বাবার সন্তানরা সব সুবিধা পাবে, আর গরিবের সন্তানরা পিছিয়ে পড়বে। লটারি পদ্ধতি তুলে দেওয়া ঠিক হয়নি। শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউই ভর্তি পরীক্ষার পক্ষে নয়। তারপরও কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো জানি না।’
নওগাঁর ধামইরহাটে বাঁশঝাড় থেকে নারীর মরদেহ উদ্ধার!