শিশু ধর্ষণকাণ্ডে উত্তপ্ত চট্টগ্রাম, নেপথ্যে কারা-খুঁজছে পুলিশ!
চট্টগ্রাম থেকে আমির হোসাইন, ক্রাইম জনতা
চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় শিশু ধর্ষণে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের পর প্রায় ১১ ঘণ্টার সংঘাতের নেপথ্যে ‘বিভিন্ন মহলের’ ইন্ধনের তথ্য পেয়েছে পুলিশ। ধর্ষণের ক্ষোভকে পুঁজি করে সংঘাত ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে ইন্ধন দেওয়া হয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)।
আজ শুক্রবার বিকেলে নগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘বাকলিয়া এলাকায় ৭২ থেকে ৭৫ শতাংশ লোক ভাসমান। এখানে অনেকগুলো বস্তি আছে। সেখানে ছিনতাইকারী, মাদকসেবী, মাদক কারবারি, পেশাদার অপরাধীদের বসবাস। আমরা এদের অনেককে গ্রেপ্তার করেছিলাম। তাদের অনেকে আবার জামিনে বেরিয়ে এসেছে। এলাকায় ফিরে নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়ার জন্য ধর্ষণের ইস্যু নিয়ে একটা পরিস্থিতি তৈরি করেছে তারা।’
বিভিন্ন গোষ্ঠী এই অপরাধীদের ইন্ধন দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলছিলেন, ‘আমরা বেশ কয়েকজনকে শনাক্ত করেছি। পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমাদের ধারণা, সংঘাতের পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ইনফ্লুয়েন্স আছে। আমরা খতিয়ে দেখছি বিষয়টি।’
এর গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে নগরীর দক্ষিণ বাকলিয়া ওয়ার্ডের নুর হোসেন চেয়ারম্যানঘাটা এলাকায় সাড়ে তিন বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে মনির হোসেন (৪০) নামে একজনকে আটক করে এলাকাবাসী। মনির ওই এলাকার ভাই ভাই ডেকোরেশন নামে একটি দোকানের কর্মচারী।
মনিরের বিরুদ্ধে আজ শুক্রবার সকালে বাকলিয়া থানায় মামলা করেন আক্রান্ত শিশুটির বাবা। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, স্বামী-স্ত্রী বাসায় না থাকায় নানীর কাছে ছিল তাদের তিন সন্তান। বৃহস্পতিবার দুপুরে মেয়ে বাসার সামনে খেলাধূলা করার সময় তাকে ফুসলিয়ে পাশের ডেকোরেশনের গুদামঘরে নিয়ে যান মনির। সেখানে ধর্ষণ করা হয় তাকে। খবর পেয়ে স্ত্রী বাসায় ফিরে মেয়েকে অজ্ঞান অবস্থায় পেয়ে নিয়ে যান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে মনিরকে শুক্রবার বিকেলে আদালতে হাজির করা হলে ১৬৪ ধারায় দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন তিনি। ওই মামলায় সাতদিনের মধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে বলে জানিয়েছেন উপকমিশনার হোসাইন কবির।
পুলিশ-জনতা সংঘাতের বিষয়ে বাকলিয়া থানা পুলিশের ভাষ্য, বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯ এ তথ্য পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে আটক মনিরকে নিজেদের হেফাজতে নেয় পুলিশ। তাকে থানায় নেওয়ার জন্য রওনা দিলে ‘কিছু দুষ্কৃতিকারী’ আটকে দেয় তাদের। এ সময় ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয় পুলিশের ওপর। এতে আহত হন কয়েকজন পুলিশ সদস্য। ঘটনাস্থলে আগুন দেওয়া হয় পুলিশের একাধিক গাড়িতে। ভাঙচুর করা হয় আরও কয়েকটি যানবাহন। এসব ঘটনায় মামলা করা হচ্ছে।
উপ পুলিশ কমিশনার হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া বলছিলেন, ‘ঢাকায় শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় সারাদেশে মানুষের মধ্যে একটা ক্ষোভ আছে। সেই ক্ষোভের জের পড়েছে চট্টগ্রামের ঘটনায়ও। ধর্ষণ হয়েছে কিংবা হয়নি, এটা মেডিকেল প্রতিবেদন পেলে বোঝা যাবে। প্রতিবেদন আদালতে সাবমিট করা হবে। কিন্তু উত্তেজিত জনতা যেভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে তাদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে, তারাই বিচার করবে বলছে, এভাবে তো আসামিকে ছেড়ে দিতে পারি না। বাধ্য হয়ে আমাদের কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ছুঁড়তে হয়েছে। পরে প্রচুর ফোর্স আনতে হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে আমাদের মাঝরাত পেরিয়ে গেছে।’
ঘটনাস্থলে কয়েকদফা ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের পর রাত ১০টার দিকে লোকজন সরতে শুরু করলে মনিরকে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। কিন্তু ততক্ষণে বাকলিয়ার তুলাতলী এলাকা পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। সেখানে সড়কে নেমে আসে হাজারো জনতা। গাড়ি ভাঙচুর, আগুন, সড়ক অবরোধ করা হয়। এতে বহদ্দারহাট-শাহ আমানত সংযোগ সেতু সড়কে বন্ধ হয়ে যায় গাড়ি চলাচল। প্রায় ১০ ঘণ্টা ধরে সংঘাতের পর রাত দেড়টার দিকে নিয়ন্ত্রণে আসে পরিস্থিতি।
হঠাৎ চট্টগ্রাম নগরীতে এমন সংঘাতমুখর পরিস্থিতি তৈরি হওয়া নিয়ে উদ্বেগ আছে সিএমপি কর্মকর্তাদের মধ্যে। এ বিষয়ে সিএমপির বিশেষ শাখার এক কর্মকর্তা বললেন, ‘আমরা ফুটেজ যাচাই-বাছাই করছি। শুরুতে এটা ছিল নিতান্তই ধর্ষণের ক্ষোভ থেকে এলাকার সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ। এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় কয়েকজন নারী গিয়ে নানাভাবে বক্তব্য দিয়ে উত্তপ্ত করেন পরিস্থিতি। এরপর মধ্যরাতে তুলাতলীর ঘটনা পুরোপুরিই পলিটিক্যালি মোটিভেটেড বলে মনে হয়েছে।’
ফেসবুকের কিছু পেইজ থেকে লাইভ করে আরও উত্তপ্ত করে তোলা হয় পরিস্থিতিকে। রাস্তায় নামার জন্য উত্তেজিত করা হয় সাধারণ মানুষকে’— বলছিলেন বাকলিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ সোলাইমান।
‘যারা রাস্তায় নেমে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করেছেন, আগুন দিয়েছেন- তাদের অনেককে আমরা শনাক্ত করেছি। আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে’ —যোগ করেন ওসি।
নওগাঁর ধামইরহাটে বাঁশঝাড় থেকে নারীর মরদেহ উদ্ধার!